ভারতের রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলকে চক্রাকারে ঘিরে থাকা ইনার রিং রোডের ঠিক ওপরেই অবস্থিত একটি চারতলা বড় বাড়ি। ডাক বিভাগের রেকর্ড অনুযায়ী, এর ঠিকানা ৫৬ রিং রোড, লাজপত নগর, দিল্লি ১১০০২৪।

ভারতের রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলকে চক্রাকারে ঘিরে থাকা ইনার রিং রোডের ঠিক ওপরেই একটি বড়, চারতলা বাড়ি অবস্থিত। ডাক বিভাগের রেকর্ড অনুযায়ী, এর ঠিকানা ৫৬ রিং রোড, লাজপত নগর, দিল্লি ১১০০২৪।

তখন ৫৬ রিং রোড ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একটি ‘সেফ হাউজ’ বা গোপন অতিথিশালা। শেখ মুজিব আততায়ীদের হাতে নিহত হওয়ার পর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন তার কন্যাকে সপরিবার ভারতে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রথমে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিল এই বাড়িটিতে।


পরে একাধিকবার মালিকানা পরিবর্তন হয়ে, ওই ভবনটি এখন একটি ছিমছাম চারতলা হোটেলে রূপ নিয়েছে, যার নাম ‘হোটেল ডিপ্লোম্যাট রেসিডেন্সি’।

মজার ব্যাপার হলো, লাজপত নগরের ওই এলাকাটি এখন দিল্লির আইভিএফ চিকিৎসার প্রধান হাবে পরিণত হয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে হাজার হাজার নিঃসন্তান দম্পতি সেখানে আসেন এবং দিনের পর দিন ওখানকার হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলোতে থাকেন।


কিন্তু, যারা বাংলাদেশের এই মেডিক্যাল ট্যুরিস্টদের মধ্যে ওই বিশেষ হোটেলটিতে থাকেন, তাদের হয়তো জানাই নেই যে, তাদের দেশের সবচেয়ে বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকা শেখ হাসিনাও তার জীবনের চরম সঙ্কটের মুহূর্তে ওই একই ভবনে আশ্রয় পেয়েছিলেন!


লাজপত নগরের ওই ঠিকানায় শেখ হাসিনা বা তার পরিবারকে খুব বেশিদিন থাকতে হয়নি। শহরের ব্যস্ততম রাস্তার ওপর একজন গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে দীর্ঘ সময় রাখা নিরাপদ নয়, বিধায় তাদের সরিয়ে নেওয়া হয় দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অভিজাত পান্ডারা রোডের একটি সরকারি ফ্ল্যাটে, যার বাইরে ঝুলন্ত ছিল ভিন্ন নামের নেমপ্লেট। সেখানে তারা প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ছিলেন।

লাজপত নগরের সেই ভবনে এসে ওঠার ৪৯ বছর পর, যখন বাংলাদেশ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা আবারও ভারতে আশ্রয় নেন, তখনও কিন্তু শহরে তার প্রথম ঠিকানায় তিনি থিতু হননি।
আজ থেকে ঠিক একশো দিন আগে, ৫ আগস্ট, চরম নাটকীয় পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা যখন ভারতে পা রাখেন, দিল্লির বিশ্বাস ছিল তার এই আগমন একেবারেই সাময়িক। ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে যাওয়ার আগে এটি ছিল একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির মতো, এবং যে কোনো মুহূর্তে তৃতীয় কোনো দেশের উদ্দেশে তিনি রওনা হয়ে যাবেন। এই ধারণা থেকেই প্রথম কয়েকদিন তাকে (এবং সঙ্গে থাকা বোন শেখ রেহানাকে) দিল্লির উপকণ্ঠে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটির টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে রাখা হয়েছিল, যার নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা ভার ছিল দেশের বিমান বাহিনীর।
কিন্তু শেখ হাসিনার তৃতীয় কোনো দেশে পাড়ি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর ভারত সরকার তাকে হিন্ডন বিমানঘাঁটি থেকে সরিয়ে দিল্লির কোনো গোপন ঠিকানায় নিয়ে আসে। পরে তাকে হয়তো দিল্লির কাছাকাছি অন্য কোনো সুরক্ষিত জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তবে এ ব্যাপারে ভারত সরকার আজ পর্যন্ত কোনো তথ্যই প্রকাশ করেনি।

তবে, 'লোকেশন' যা-ই হোক, ভারতে শেখ হাসিনার পদার্পণের একশো দিনের পর এই প্রশ্নটা ওঠা খুব স্বাভাবিক যে, এখন তাকে কীভাবে এবং কী ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে? আর তার পেছনে আসল কারণ কী?



এছাড়া, এই ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি সিচুয়েশন’ বা চরম অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা স্বাধীনভাবে কতটা এবং কী করতে পারছেন? কিংবা ‘হোস্ট কান্ট্রি’ হিসেবে ভারত কি তাকে কোনো কাজ না করার অনুরোধ করেছে?

দিল্লিতে একাধিক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও ওয়াকিবহাল মহলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে বিবিসি বাংলা যে উত্তর পেয়েছে, এই প্রতিবেদনে তার সারাংশ তুলে ধরা হয়েছে।
নিরাপত্তা প্রোটোকলটা ঠিক কী রকম?

সরকারি পদমর্যাদা ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি বিবেচনায়, ভারতের ভিভিআইপি-রা বিভিন্ন ক্যাটেগরির নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন, যার মধ্যে ‘জেড প্লাস প্লাস’ সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা মানদণ্ডে আয়োজন করা হয়, যেখানে ‘স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ’ বা এসপিজি কমান্ডোরা সাধারণত বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলান।

যারা নিয়মিত প্রকাশ্যে আসতে হয়, তাদের নিরাপত্তা আরও কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হয়। আবার, যারা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে পারেন, তাদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার আয়োজন কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের হয়।
তাহলে, ‘অপ্রত্যাশিত অথচ অতি গুরুত্বপূর্ণ’ অতিথি শেখ হাসিনার জন্য ভারত এখন ঠিক কোন ধরনের নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করছে?

হুবহু এই প্রশ্নটাই করেছিলাম ভারতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে, যিনি গত একশো দিন ধরে ভারতে শেখ হাসিনার প্রতিটি পদক্ষেপের বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত।

ক্ষুদে বার্তায় তিনি ছোট ছোট তিনটে বাক্যে এই প্রশ্নের যে উত্তর দিলেন, তা ছিল এরকম:

এক. “বেয়ার মিনিমাম, প্লেইন ক্লোদস, নো প্যারাফারনেলিয়া!”  
অর্থাৎ, যেটুকু না-হলে নয়, শেখ হাসিনাকে সেটুকু নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। সাদা পোশাকের রক্ষীরা তার চারপাশে ঘিরে রয়েছেন (জলপাই রঙা উর্দির কমান্ডো বা সেনা সদস্যরা নয়), এবং পুরো বিষয়টাতে কোনও আতিশয্য রাখা হয়নি! অর্থাৎ, ঢাকঢোল পিটিয়ে বা ঘটা করে তাকে কোনো নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে না, বরং পুরো বিষয়টিকে খুব নিচু তারে বেঁধে রাখা হয়েছে।

দুই. “ইন হার কেস, সিক্রেসি ইজ দ্য সিকিওরিটি!”  
(অর্থাৎ, তার নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো গোপনীয়তা!)
সোজা কথায়, তার বেলায় গোপনীয়তাই হল নিরাপত্তা! এর মানে সহজ—শেখ হাসিনার অবস্থান সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে গোপনীয়তা রক্ষার ওপর, কারণ তিনি কোথায় এবং কীভাবে আছেন, সেটা যতটা গোপন রাখা যাবে, ততটাই তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

তিন. “মুভমেন্টস অ্যান্ড ভিজিটস– অ্যাজ লিটল অ্যাজ পসিবল!”

অর্থাৎ, ওই কর্মকর্তা তার তৃতীয় বাক্যে জানাচ্ছেন, শেখ হাসিনাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া, কিংবা তার সঙ্গে অন্যদের দেখা করানোর ব্যবস্থা—এটাও যতটা সম্ভব এড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে, শেখ হাসিনার মুভমেন্টস বা ভিজিটস যে পুরোদমে বন্ধ নয়, তার কথায় সে ইঙ্গিতও ছিল!
ওই কর্মকর্তার কথা থেকে স্পষ্ট, শেখ হাসিনার জন্য কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেও, সেটা খুব বিশেষ এক ধরনের আয়োজন। মানে, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য যে ধরনের নিরাপত্তা থাকে, তার সঙ্গে সেটার মাত্রায় তুলনীয় হলেও, আয়োজনের দিক থেকে তা একেবারেই ভিন্ন ধরনের।
শেখ হাসিনাকে যাতে কোনওভাবেই প্রকাশ্যে না-আসতে হয়, এই প্রোটোকলে সেই চেষ্টাও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। 

ফলে দিল্লির মর্নিং ওয়াকারদের স্বর্গ লোধি গার্ডেনে তিনি এসে মাঝেমাঝে হাঁটাহাঁটি করে যাচ্ছেন কিংবা ইচ্ছে করলে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগায় বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যায় কাওয়ালি শুনে আসছেন—এই ধরনের যাবতীয় জল্পনা হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন ভারতের সংশ্লিষ্ট মহলের কর্মকর্তারা! 

তাদের মতে, শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়েছে, এর মানে হলো তার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দায়িত্বও এখন ভারতেরই কাঁধে। সেখানে সামান্য কোনও ভুলচুক হলেও তার দায় ভারতের কাঁধে আসবে এবং সেটা দিল্লির জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর হবে।
ফলে সেই নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না এবং তার জীবনকে সামান্যতম ঝুঁকিতেও ফেলা যাবে না; পাশাপাশি পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গোঘনিষ্ঠজনদের সাথে মেলামেশা?

গত ৫ আগস্ট যখন শেখ হাসিনা দিল্লিতে এসে পৌঁছান, তখনই সন্ধ্যায় দিল্লির কংগ্রেসের একদা মুখপাত্র শর্মিষ্ঠা মুখার্জি তার এক্স হ্যান্ডল থেকে একটি টুইট করেন। 

টুইটে তিনি লেখেন, “স্টে সেফ অ্যান্ড স্ট্রং, হাসিনা আন্টি। টুমরো ইজ অ্যানাদার ডে, মাই প্রেয়ার্স আর উইথ ইউ!” 

শেখ হাসিনাকে ‘আন্টি’ বলে ডাকতে পারেন দিল্লিতে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি ছাড়া এমন আর দ্বিতীয় কেউ আছেন কিনা বলা কঠিন! তবে প্রিয় আন্টিকে মানসিক শক্তি জোগানোর কথা তিনি এক মুহূর্তও দেরি করেননি।পন রাখতে হবে। এসব বিবেচনায় নিয়েই সাজানো হয়েছে তার নিরাপত্তা প্রোটোকল।

আসলেই শর্মিষ্ঠা মুখার্জির আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি ভারতের প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির কন্যা। খুব ছোটবেলায় শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে তাদের যে নিবিড় ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল, তা আজও এতটুকু ম্লান হয়নি। এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই তিনি সেদিন হাসিনা আন্টির জন্য সেই মনোবল জোগানো কথাগুলো বলতে পেরেছিলেন।

পঁচাত্তরে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে আশ্রয় দেন, তখন তাদের ‘স্থানীয় অভিভাবক’ হিসেবে সবকিছু দেখাশুনোর দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রণব মুখার্জির ওপর। দিল্লি, যা মূলত হিন্দি ও পাঞ্জাবিভাষীদের শহর, সেখানে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের জন্য নির্ভেজাল বাংলায় কথা বলতে পারাটাও ছিল একটি বড় ব্যাপার, যা তাদের সান্ত্বনা ও সহায়তা প্রদান করেছিল।
প্রণববাবুর স্ত্রী শুভ্রা মুখার্জির সঙ্গে শেখ হাসিনারও নিবিড় পারিবারিক বন্ধন গড়ে উঠেছিল। আর শেখ হাসিনার মেয়ে পুতুল ও প্রণববাবুর কন্যা শর্মিষ্ঠা ছিল প্রায় সমবয়সী। এই দুটি বাচ্চা মেয়ে প্রায়ই দিল্লির পান্ডারা রোড থেকে হাঁটাপথের দূরত্বে থাকা ইন্ডিয়া গেটের প্রশস্ত লনে খেলতে চলে যেত। 

প্রণববাবু একবার হাসতে হাসতে এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, “নিজের ছেলেমেয়েদের কখনও সেভাবে সময় দিতে পারিনি, কিন্তু মিসেস গান্ধীর নির্দেশে আমি শেখ হাসিনার ছেলে-মেয়ে, জয় আর পুতুলকে নিয়ে হরিয়ানার দমদমা লেকে বোটিং পর্যন্ত করিয়েছি!” 

এইসব স্মৃতি থেকে স্পষ্ট হয়, প্রণব মুখার্জির পরিবার এবং শেখ হাসিনার পরিবারের মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক ধরনের পারিবারিক বন্ধন, যা আজও অব্যাহত রয়েছে।

প্রয়াত পিতাকে নিয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জি গত বছর ‘প্রণব মাই ফাদার’ নামে যে স্মৃতিচারণাটি লিখেছেন, তাতেও তিনি উল্লেখ করেছেন যে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দিল্লিতে প্রণববাবুর কাছে হুটহাট ফোন করতেন। 

প্রণব মুখার্জি হয়তো তখন দেশের অর্থ, প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এবং হাসিনা যখন ফোন করতেন, তিনি তাকে মনে করিয়ে দিতেন যে একজন প্রধানমন্ত্রীকে অন্য দেশের মন্ত্রীকে সরাসরি ফোন করা ঠিক বিধিসম্মত নয়। কিন্তু শর্মিষ্ঠা মুখার্জি জানান, তখন হাসিনা তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলতেন, “আরে রাখেন তো আপনার প্রোটোকল! শোনেন, যে জন্য ফোন করলাম...”
ওপরের এতগুলো কথা এই জন্যই বলা, যে দিল্লিতেও এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা রাজনীতি বা কূটনীতির ঊর্ধ্বে উঠে শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যামিলি’ বলে ভরসা করতে পারেন। 

দিল্লিতে দীর্ঘসময় থাকার সুবাদে শেখ হাসিনার নিজস্ব পরিচিতির একটি বলয় গড়ে উঠেছিল, যাদের মধ্যে কেউ কেউ এখনও জীবিত বা সক্রিয় আছেন। এর মধ্যে ভারতের সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল অশোক তারা অন্যতম, যিনি একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর সকালে ধানমন্ডিতে পাকিস্তানি সেনাদের পাহারায় থাকা শেখ হাসিনা ও মুজিব পরিবারের সদস্যদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। আজও অশোক তারা ও তার স্ত্রীর সঙ্গে শেখ হাসিনার দারুণ সুসম্পর্ক রয়েছে।

এছাড়া, ঢাকায় কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গেও শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য রয়েছে।
বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে, গত একশো দিনে শেখ হাসিনার পুরোনো ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে কেউ কেউ তার সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন। এই ধরনের 'ভিজিট' হাতে গোনা হতে পারে, তবে ভারত সরকারও সচেতনভাবে এই ধরনের সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছে, যাতে তার ভিভিআইপি অতিথি মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকতে পারেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা অবাধ? 

গত মাসে শেখ হাসিনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কথিত ফোনালাপের কিছু অডিও 'ভাইরাল' হয়েছে, যার মধ্যে একপক্ষের কণ্ঠস্বর হুবুহু শেখ হাসিনার মতো শোনাচ্ছে। যদিও ভারত সরকার এই ‘ফাঁস’ হওয়া অডিও নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে একাধিক পদস্থ সূত্র স্বীকার করেছে যে, এগুলো বাস্তবিকই শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বর।

দিল্লির নর্থ ব্লকের একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, "আমি জানি না, এটা এআই দিয়ে বানানো হয়েছে, না কি শেখ হাসিনার নিজেরই গলা— তবে তার তো পরিচিতদের সঙ্গে কথাবার্তা বলায় কোনো বিধিনিষেধ নেই। এখন কেউ যদি সেই আলাপ রেকর্ড করে লিক করে দেয়, তাতে আমাদের কী করার আছে?"

কিছু পর্যবেক্ষক ধারণা করছেন, শেখ হাসিনাকে তার দলের নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে সহায়তা করার জন্য দিল্লিই এসব কথাবার্তা হতে দেয়, এবং পরে সুযোগ বুঝে তা 'লিক'ও করে দেয়, যাতে এটি বেশি লোকের কাছে পৌঁছাতে পারে।

এর আসল কারণ কী, তা যাই হোক, বাস্তবতা হল শেখ হাসিনা ভারতে কোনও গৃহবন্দি বা রাজনৈতিক বন্দি নন। ফলে তিনি দেশে-বিদেশে তার পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। 

ওই কর্মকর্তা আরও বলেছিলেন, “ভারতে যখন কোনও রাজনৈতিক নেতা গৃহবন্দি হন, তখন তার বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের অধিকারও কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়।” উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, “যেমন ধরুন, পাঁচ বছর আগে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করার পর যখন ওমর আবদুল্লা বা মেহবুবা মুফতিদের গৃহবন্দি করা হয়, তখন তারা দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা তো দূরের কথা, মোবাইল বা ইন্টারনেট সংযোগও পাননি!”

এখান থেকে স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনা ভারতে মোটেই গৃহবন্দি নন। তার প্রমাণ, তিনি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলছেন। 

দিল্লিতে থাকা মেয়ে সাইমা ওয়াজেদ বা ভার্জিনিয়াতে থাকা ছেলে সজীব ওয়াজেদের সঙ্গেও তার প্রায় রোজই যোগাযোগ হচ্ছে। এছাড়া, তিনি নিউজ চ্যানেল, খবরের কাগজ বা ইন্টারনেটেও সম্পূর্ণ অ্যাক্সেস পাচ্ছেন।

তবে ৫ই অগাস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের যে নেতাকর্মীরা পালিয়ে ভারতে চলে এসেছেন, তাদের কারও সঙ্গে শেখ হাসিনার যোগাযোগ হলেও, এরা কেউই সশরীরে (ইন পার্সন) দলনেত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি।
ভারতের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে তিনি ভারতে বসে প্রকাশ্যভাবে কোনও রাজনৈতিক বিবৃতি না দেন। এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য, যাতে কেউ এই ধারণা তৈরি না করতে পারে যে ভারত, শেখ হাসিনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছে। 

একটি বড় কারণ, শেখ হাসিনার কোনও ভেরিফায়েড ফেসবুক বা এক্স অ্যাকাউন্ট নেই, যা ভারতের জন্য স্বস্তির বিষয়, কারণ সেখানে তার কোনও পোস্ট বা রাজনৈতিক বক্তব্য আসছে না। 

তবে প্রশ্ন থাকে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পুনর্বাসন আদৌ সম্ভব কি না। এই বিষয়ে ভারতের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি, কিন্তু ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, এই কাজটি শুধু কঠিন নয়, অত্যন্ত কঠিন। 

তিনি বলেন, "এখনও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সে দেশে ক্ষোভ-বিক্ষোভ চলছে, তাদের দলীয় সংগঠনও ছত্রভঙ্গ। শেখ হাসিনার বয়স আজকের চেয়ে দশটা বছর কম হলে হয়তো মনে করা যেত, তিনি দেশে ফিরে দলের হাল ধরবেন, কিন্তু এখন সেটি প্রায় অসম্ভব।"


সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে শেখ হাসিনার মতো কণ্ঠস্বরে শোনা গিয়েছিল, "আমি (বাংলাদেশের) খুব কাছাকাছিই আছি, যাতে চট করে ঢকে পড়তে পারি!" এই অডিওটি বিভিন্ন রাজনৈতিক গুঞ্জন উস্কে দিয়েছে, বিশেষ করে গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ের পর, অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হয়তো মনে করছেন, তাদের নেত্রী দেশে ফিরে আসা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

তবে শেখ হাসিনা বর্তমানে যেই দেশের আতিথেয়তায় আছেন, তারা এত তাড়াহুড়া করতে রাজি নয়। ভারতের সাউথ ব্লকের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেছেন, "পিচ এখনও প্রতিকূল, বল উল্টেপাল্টা লাফাচ্ছে। এরকম সময় চালিয়ে খেলতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে!" তিনি আরও বলেন, "এখন বরং ধৈর্য দেখানোর সময়, ফলে প্রতিপক্ষের লুজ বলের জন্য অপেক্ষা করাটাই শ্রেয়," এবং এই ব্যাখ্যার সাথে হেসে ক্রিকেটের উপমা দেন তিনি।

রাজনীতির উইকেটে পোড় খাওয়া ব্যাটার শেখ হাসিনাও নিশ্চয়ই বুঝে থাকবেন, যে উপযুক্ত সুযোগ এলে তবেই তাকে কাজে লাগাতে হবে। একশো দিনের পর, ভারতও আপাতত তাদের ভাবনাকে এখানেই সীমাবদ্ধ রেখেছে !