সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা হওয়ার পর থেকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর অবস্থান ও তাঁর সিনেমা নিয়ে নানা সমালোচনা করা হচ্ছে। এ নিয়ে ফারুকী প্রথমবারের মতো ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন এবং তাঁকে নিয়ে ছড়ানো বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দেন।
ফারুকী স্ট্যাটাসের শুরুতে লেখেন, ‘যা আগে কখনো কল্পনাও করিনি, এখন তা–ই করতে হচ্ছে। যা–ই হোক, শুরু করি। আমি মাত্র দুই দিন হলো কাজ করছি, আর এর মধ্যেই আমার মনে হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের সহকর্মীদের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছাতে পেরেছি যে আমরা দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি, যা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সংস্কৃতিকর্মীদের কাজে আসবে। যদিও আমি কোনো পদ চাইনি, তবুও দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কেউ কেউ তাঁকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলছেন, এ ছাড়া নানা অভিযোগও শুনতে হচ্ছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে।
এ প্রসঙ্গে ফারুকী লিখেছেন, ‘কিন্তু এরই মধ্যে আমাকে এক অবিশ্বাস্য অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে—আমি নাকি ফ্যাসিস্টের দোসর! যে ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবনের বড় ঝুঁকি নিয়ে ১৬ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পাশে দাঁড়ালাম, সবকিছু ত্যাগ করে লড়াইয়ে গেলাম, এটা জেনেও যে ফ্যাসিস্ট হাসিনা ক্ষমতায় টিকে গেলে আমার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে মৃত্যু অথবা জেল। সেই ফ্যাসিস্টের সহযোগী আমি?’
ফারুকী আরও লিখেছেন, ‘উপদেষ্টার চেয়ারের পক্ষে সাফাই গাওয়ার প্রয়োজন মনে করি না; তবে একজন শিল্পী হিসেবে অপমানিত বোধ করেছি, তাই কিছু কথা বলতে চাই।’
শাহবাগ আন্দোলনে তাঁর সমর্থন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে ফারুকী লিখেছেন, ‘শাহবাগ আন্দোলন যখন শুরু হয়, আমিও প্রথমে ভেবেছিলাম এটি নির্দলীয়। তাই আমার পোস্টগুলোতে এই আন্দোলনকে "রাষ্ট্র মেরামতে"র এজেন্ডার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পর যখন বুঝতে পারলাম পরিস্থিতি ভিন্ন, তখনই লিখলাম "কিন্তু এবং যদির খোঁজে"। সেই "কিন্তু" এবং "যদি" শাহবাগ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে আজকের যে ফ্যাসিবাদের শুরু হয়েছিল, তার প্রতিবাদে লিখলাম, "এই চেতনা লইয়া আমরা কি করিবো"।’
পরিচালক হিসেবে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কখনোই বিরত থাকেননি। ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার জন্য বিভিন্ন সময় হেনস্তার শিকার হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন লেখক যেমন স্বাধীনভাবে লিখতে পারেন, ফ্যাসিবাদের কালে আমার সেই স্বাধীনতা ছিল না। তবুও যতটুকু পেরেছি, করেছি, যার ফলও ভোগ করতে হয়েছে। ২০১৫ সালে সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন সেলের হেনস্তার মধ্য দিয়ে যে দীর্ঘ অত্যাচারের শুরু—তার বিস্তারিত তুলে ধরে সহানুভূতি পাওয়ার ইচ্ছা বা প্রয়োজন আমার নেই।’
কেউ কেউ ফারুকীকে ‘ভারতীয় দালাল’ বলেও উল্লেখ করেছেন। এর জবাবে তিনি লিখেছেন, ‘অনেকে বলছে, আমি নাকি ভারতীয় আধিপত্যের অংশ। যে মানুষটাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনেকে ঘৃণা করে শুধুমাত্র কলকাতাকেন্দ্রিক ভাষার আধিপত্য ভাঙার জন্য, সে-ই নাকি এই আধিপত্যের অংশ! আমি কোনো দেশের ব্যাপারে ঢালাওভাবে নেতিবাচক মন্তব্য করি না, কারণ প্রতিটি দেশেই ভিন্ন ভিন্ন মতের মানুষ থাকে। আমি সবার সঙ্গে কথা বলতে চাই, কাজ করতে চাই; তবে আমার দেশের স্বার্থের ক্ষতি হলে তার প্রতিবাদে বলতে আমি কখনো দ্বিধা করি না। ফেলানীর মৃত্যু নিয়ে ২০১৩ সালে আমার দেওয়া পোস্টটা চাইলে দেখুন।’
ফারুকী আরও লিখেছেন যে তাঁর অবস্থানের কারণে ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের অসন্তোষের শিকার হতে হয়েছে। এমনকি অনেকেই তাঁকে গালমন্দও করেছেন। এসব কারণে তিনিও সবসময় ভয়ে থাকতেন এবং কথা বলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হতো, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলেছে। ফারুকী লিখেছেন, ‘মনে আছে, ২০১২ সালে শুধু কথা বলার জন্য আমি আর “আরিফ আর হোসাইন” লুকিয়ে আমেরিকান ক্লাবে বসে আলাপ করতাম, কীভাবে এই জালিম সরকারকে হটানো যায়। বিএনপি আর জামায়াত কিছু করতে পারবে? আর্মির মনোভাব কী? জোনায়েদ সাকির সঙ্গে বাটন ফোনে কথা বলে গোপনে দেখা করতাম আর পরামর্শ করতাম কী করা যায়। সেই আমি কি আওয়ামী ফ্যাসিজমের অংশ?’
শেষে ফারুকী লিখেছেন, ‘আমি কখনো বিপ্লবী ছিলাম না, নইও। আমি একজন ফিল্মমেকার। ঘটনাচক্রে এবং আল্লাহর রহমতে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, সেই পরিচয়েই আমি গর্বিত। আমি মারা গেলে মানুষ আমাকে একজন ফিল্মমেকার হিসেবেই মনে রাখবে, মন্ত্রী হিসেবে নয়। তাই মন্ত্রিত্ব আমার কাছে কোনো ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি শুধু পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন। আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি, কারণ বিশ্বাস করেছি যে আল্লাহ আমাকে আমার ফিল্মের বাইরেও দেশের জন্য কিছু করার সুযোগ দিয়েছেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে লাভ-ক্ষতির চিন্তা না করে এই ক্ষমতাকে দেশের জন্য কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শেষ কথা, আমি আমার কাজকে ভালোবাসছি, কিন্তু এই কথা লিখতে বাধ্য হওয়াটা একেবারেই অপছন্দ করছি!’



0 Comments